বন্যা নিয়ে আলাপচারিতায় ইতিহাসের জানাবোঝার দরকার কী!

স্বাধীন সেন

বাংলাদেশের দক্ষিনপূর্বাঞ্চলে এবং উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশে এই মুহূর্তে মানুষ ও অন্যান্য জীব ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত। মানুষের বসতি, জীবন, জীবিকা এবং নৈমিত্তিক বেঁচে থাকা সঙ্কটাপন্ন। ভারতের আসাম-মেঘালয়ের ব্রক্ষ্মপুত্র অববাহিকার বহু মানুষ ও বসতি বন্যার কারণে বিপন্ন। বহু মানুষ প্রাণও হারিয়েছেন। বহু মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়েছেন। অভিবাসিত হয়েছেন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে। শস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন অবকাঠামো নষ্ট হয়েছে।

সূত্র: https://www.theindependentbd.com/post/264407

বাংলাদেশে আধুনিক বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বহু কাজ হয়েছে। বহু কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য ফ্লাড অ্যাকশন প্লান হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনার যুক্ত হয়েছেন। এখন সেই যুক্ততা আরো বেড়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কালে নানামুখি তৎপরতার কারণে। কিন্তু এত পরিকল্পনা-বিভিন্ন নীতিমালার বাস্তবায়ন-শত শত গবেষণা প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন প্রকাশ- অসংখ্যা দেশী ও বিদেশী পরামর্শক ও অংশীদারের সম্পৃক্ততা- বন্যার পূর্বাভাসে আর হিসাবনিকাশে নানাধরনের নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ-নদী ব্যবস্থাপনা ও শাসন-বাঁধ তৈরি করাসহ বিপুল কর্মযজ্ঞের পরেও প্রতিবছরই বন্যা হয়। জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ভয়াবহ বিপর্যয় হয় কয়েক বছর পর পর।

বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এই ব্যর্থতার নানাবিধ কারণ ব্যাখ্যা করেন। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিকল্পনায় গলদ, দুর্নীতি। প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাষণ ব্যবস্থা মানুষের লোভ ও দখলের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া। পশ্চিমা দেশের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের নদী ও বন্যাকে বুঝতে চেষ্টা করা। আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অধীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমার বাইরে থেকে আসা (বা বাইরে যাওয়া) নদী ও নদী অববাহিকার ব্যবস্থাপনার অভাব। ভারতের সঙ্গে অসম নদীর পানি বন্টন ব্যবস্থা। বাইরে থেকে আসা নদীগুলোর উচ্চ নদীপ্রবাহে বাঁধ দেওয়া। বিভিন্ন সময়ে দরকার মতন সেইসব বাঁধ খুলে দেওয়া। চিনের আওতাধীন নদী প্রবাহপথে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ। যত্রতত্র বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য বাঁধ দেওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এসব ব্যাখ্যার সঙ্গে আরো অনেক ব্যাখ্যাই যুক্ত করা যেতে পারে। তাদের অনেক ব্যাখ্যাই সম্ভবত সঠিক। কিন্তু বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের আলাপ-আলোচনাই প্রকটভাবেই বর্তমান কেন্দ্রীক। ভবিষ্যতের মুক্তির আকাঙ্খা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত।

আমার বিষ্ময় এখানেই। গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের অধিকাংশ জমি জুড়ে জালের মত বিন্যস্ত, অসংখ্য সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় সারাবছর ধরে জল থাকা, কিংবা বিশেষ ঋতুতে জল ধারণকারী বা মরা খাত বিশিষ্ট অগণিত নদীনালা দ্বারা প্রভাবিত ও গঠিত, অগণিত জলাভূমিময় এই ভূখণ্ডের অতীত পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কিত বেশিরভাগ আলাপচারীতায়ই ইতিহাস আর ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত। কখনো এই ইতিহাস উপস্থিত থাকলেও থাকে খুব উপরিতলীয় ভাবে। কয়েক দশক বা ছোট সময়কালের কিছু প্রবণতা বিশ্লেষণ করে কিছু নিয়ম-সূত্র-প্রবনতাকে শনাক্ত করতে পারাটাই এসব উপরতলীয় ও ক্ষুদ্র কালিক পরিসরের বিশ্লেষণের প্রধান উদ্দেশ্য। ভাবতে পারেন, বর্তমানের সমস্যা সমাধান করে ভবিষ্যতে এসব সমস্যার মোকাবিলা করা এবং সমাধান করার পথ খোঁজাই তো সবচেয়ে জরুরি। আরো ভাবতে পারেন, আমি যেহেতু ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী, সেহেতু সবকিছুতে অতীত ও ইতিহাস টেনে আনাটা একধরনের পক্ষপাত, বা ব্যক্তিগত কুসংস্কার। আমরা সবাই যখন মানুষের অতীত ও ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী, তাও নিজেদের দরকার ও খায়েশ অনুসারে, তখন নদী-জমি-বন্যার ইতিহাস নিয়ে ভাবার দরকার তো নাইই। বরং এগেুলো বিদ্যায়তনিক কচকচানী, প্রলাম, বা হাস্যকর ভাবনাচিন্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার বা গবেষকদের মতিভ্রম বা বাস্তবতাবোধ ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাব হিসেবেও আমার এই বিষ্ময়কে বিবেচনা করতে পারেন। বলতে পারে এসব তত্ত্বকথা। বাহুল্য। মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টামাত্র। এমন অভিযোগ বা অনুযোগ কিংবা বিদ্রুপ, অথবা অবজ্ঞা আপনারা করতেই পারেন। আমি মনে করি, আমাদের দাপুটে নদী-পানি-বন্যা নিয়ে ভাবনাচিন্তায় বর্তমান সমস্যা সমাধান করে ভবিষ্যত ‍উন্নয়ন ও কল্যান নিশ্চিত করাটাই কেন্দ্রীয় প্রবণতা। আপনার বিদ্রুপ-অবজ্ঞা-লঘুকরণ-ঠাট্টা-গালাগালি এই কেন্দ্রীয় প্রবণতারই প্রকাশমাত্র। কিন্তু আমি আপনার এই প্রকাশকে অবজ্ঞা-ঠাট্টা-খারিজ করতে আগ্রহী না। আমার আগ্রহ ও উদ্দেশ্য এই দাপুটে চিন্তা ও তৎপরতাকে প্রশ্ন করা। এই প্রবল জানাবোঝার আর কাজ করার ঐতিহ্য কেন ও কীভাবে তৈরি হলো তা খোঁজা। এই ঐতিহ্যের সমস্যাগুলো কী কী পারে তার একটা প্রস্তাবনা পেশ করার চেষ্টা করা।

২.

বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভাত-কাপড়ের বন্দোবস্ত সবার জন্য সারাজীবন করতে গেলে অতীত ও ইতিহাস জানা খুব জরুরি। ইতিহাস জেনে ভাত-কাপড়ের বন্দোবস্ত করা যায় এমন পাগলের প্রলাপ না-বকার ব্যপারে আমি সজাগ আছি। স্বীকার করে নিতে সংশয় নাই কোনোই। এমনিতেই আমাদের দেশে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব পড়ুয়াদের চাকরিবাকরি হাল খুবই খারাপ। আর ইতিহাস জানাবোঝাকে সরাসরি বাস্তব জীবনের বৈষয়িকতার সঙ্গে সম্পর্কিত করার বিপদও অনেক। তবে মনে রাখা দরকার, প্রতিটি মানুষের ইতিহাসচেতনা রয়েছে। এমনকি, জাতিতাত্ত্বিক গবেষণার বিভিন্ন বিশ্লেষণ আমরা করেছি তাতে আমাদের মনে হয় বিদ্যায়তনের বাইরের, ইতিহাসশাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা প্রভাবের বাইরের বহু মানুষের তাদের পরিপার্শ্ব, স্থানবোধ, আর প্রতিবেশ-চেতনা প্রেশিক্ষিত ও বিশেষজ্ঞদের তুলনায় ভিন্ন। এবং সেই ইতিহাসবোধ অনেক বেশি যাপনের অভিজ্ঞতায় কথাই মূলত বলতে চাইছি। এসব মানুষের ইতিহাসচেতনা স্মৃতি আর শ্রুতির মাধ্যমে দেহবিজড়িত উপলব্ধির জগতে জল-নদী-জমি-বৃষ্টি-জঙ্গল-জলাভূমির মিথষ্ক্রিয়া অনুভবে ও ব্যাখ্যা করতে অনেক বেশি কার্যকর। ভাত-কাপড় বলতে তাই আমি এখানে নৈমিত্তিক যাপনের পরিসরে অনুভব-উপলব্ধি-জ্ঞান-সংবেদকে বোঝাতে চাইছি। আমার প্রস্তাব হলো, গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপে জল-স্থল-অন্তরীক্ষর যুক্ততার (আর বিযুক্ততার) ইতিহাস জানায় বিদ্যায়তিক, বা জনপরিসরের অবজ্ঞা-অনাগ্রহ-লঘুকরণ প্রবল চিন্তারই প্রকাশ। আর সমসত্ত্ব ও বিশ্বজনীন ধারণা ও পদ্ধতিতে প্রতিবেশের ব্যাখ্যা করাকে খারিজকরণ আমাদের ভবিষ্যতকে আরো অনিশ্চিত ও বিপদসঙ্কুল করে তুলেছে। আমাদের অস্তিত্ত্বের বিপন্নতা, নিত্য দিন যাপনে সঙ্কট আর প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনার ভয়াবহতা এই অনৈতিহাসিক চিন্তাভাবনা ঘনীভূত করেছে।

এই উপলব্ধি কেবল আমার না। অধুনা জলবায়ু পরির্তনের হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে নানা শাস্ত্রের আর শাস্ত্রের-বাইরের মানুষজনেরই এমন উপলব্ধি ব্যতিক্রম না। মানুষ ও প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচনা করে প্রকৃতিকে কেবলই মানুষের দরকার মতন শাসন, নিয়ন্ত্রন, দখল ও ব্যবহার করার যে ঐতিহ্য আধুনিক উপনিবেশ তৈরি করেছে, সেই ঐতিহ্যর বিকল্প খোঁজার বিভিন্ন প্রস্তাবনা অনেকেই দিয়েছেন। এই বিকল্প খোঁজার জন্য কোনো সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন প্রকল্প তৈরি করার দুর্বলতা সম্পর্কেও অনেকে আলোকপাত করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশ বিপর্যয় বৈশ্বিক ভাবে ঘটলেও, সেই পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে পড়ছে। বিদ্যমান বৈশ্বিক অসমতা, বৈষম্য আর অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতার ভিন্নতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত বিভিন্ন প্রভাব পৃথিবীর সর্বত্র সকল মানুষের, সকল সমাজের, সকল রাষ্ট্রের উপরে একইভাবে পড়ছে না। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব অবধারিত ভাবেই বিশ্বজনীন অসমতা, আর ভয়াবহ বৈষম্যর সঙ্গে সম্পর্কিত। তথাকথিত উন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন চিন্তা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও ক্রমবর্তমান ভোক্তা সংস্কৃতির প্রভাব পড়ছে আমাদের মত জনবহুল আর দরিদ্র দেশের মানুষের জীবনে, যাপনে আর প্রকৃতিতে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামের আলাপ-বিতর্কগুলো এসব অসমতা ও দায়দায়িত্ব স্বীকার করা বা অস্বীকার করার দলিল হয়ে আছে।

সমস্য বৈশ্বিক হলেও, সমাধান খোঁজার তৎপরতায় ও চিন্তায় তাই স্থানীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রসঙ্গ ও বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার আলাপ এখানেই উঠেছে। শুনতে আশ্চর্য শোনালেও। এই বদ্বীপের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে ছোটনাগপুর মালভূমি আর গাঙ্গেয় সমভূমির উত্তরাংশ। পূর্বে হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণমূখী সম্প্রসারণ।  এখানকার বন্যাকে বুঝতে গেলে কয়েকটি প্রসঙ্গ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে:

এক. আমাদের বঙ্গীয় বেসিনের অনেকগুলো প্রধান নদীনালা হিমালয় পর্বতমালায় বা হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলে উদ্ভব হয়ে ওই পাদদেশীয় জমি-উদ্ভিদ-প্রাণীজগতের পরিসর পার হয়ে আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। কেবল সুরমা-কুশিয়ারা-ব্রক্ষ্মপুত্র-ধরলা-তিস্তা-করতোয়া-টাঙ্গন-পুনর্ভবা-মহানন্দাই না। পাদদেশীয় অঞ্চলে অসংখ্য ট্রিবিউটারি যেমন নদীগুলোতে যুক্ত হয়েছে, তেমনই ছোট ছোট অনেক নদী পাদদেশীয় অঞ্চল অতিক্রম করে এসে আমাদের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে নদীগুলোতে যুক্ত হয়েছে। এসব নদী তার চলার পথে তৈরি করেছে অসংখ্য আলাদা আলাদা জলাভূমি। ভিন্ন ভিন্ন বাস্তুতন্ত্র গঠিত হয়েছে। সিলেটের টিলা এলাকার বাস্তুতন্ত্র আর হাওর ও জলাভূমি এলাকার বাস্তুতন্ত্র আলাদা আলাদা। কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত। তার সঙ্গে ব্রক্ষ্মপুত্রের পশ্চিম পাড়ের নীলফামারী-কুড়িগ্রামের-রংপুরের বাস্তুতন্ত্রর ফারাক যেমন আছে। তেমন সম্পর্কও আছে। তিস্তা বা করতোয়া বা ধরলা বা দুধকুমার বা মহানন্দা-পুনর্ভবা-করতোয়া-টাঙ্গন-পূনর্ভবাও যে জমি পার হয়েছে তাদের প্রবাহপথে সেই জমির প্রকৃতি-ভুমিরূপ-বৈশিষ্ট্য একেক জায়গায় একেক রকম। সেই জমিগুলোর উদ্ভিদরাজি একেক জায়গায় একেক রকম। সেই নদীর প্রস্থ, নদীতলের উচ্চতা ও ঢাল, গভীরতা আর পানির পরিমান একেক জায়গায় একেক রকম।

দুই. মৌসুমী বায়ুপ্রবাহ যে বৃষ্টিপাত ঘটায় সেই বৃষ্টিপাতও নানান ধরনের জমি ও জীবজগতে ভিন্ন ভিন্ন পরিমানে ঘটে। প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের নদীগুলো ও জলাভূমিগুলো এই বৃষ্টিপাতের জলই প্রধানত বয়ে নিয়ে চলে। কিছুটা জল ভূগর্ভস্থ জল হিসেবে জমা হলেও, বেশিরভাগ বৃষ্টির পানিই ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের উপর দিয়ে একটা জটিল নেটওয়ার্কে প্রবাহিত হয়ে শেষাব্দি এই নদীনালাগুলোতেই পড়ে। সঙ্গে নিয়ে চলে ক্ষয় করা মাটি বা পলল। সেই ক্ষয় করা পলল আবার এই জলপ্রবাহদ্বারাই সঞ্চিত হয়ে তৈরি হয় নতুন জমি। প্রবাহ-ক্ষয়-সঞ্চয়-গঠন-প্রবাহ-ক্ষয়-সঞ্চয়….  এই চক্রেই আবর্তিত হয় জল-স্থল-অন্তরীক্ষের যৌথতা আমাদের বদ্বীপে। ঠিক জীবনের মতনই জন্ম-বড় হওয়া-বুড়ো হওয়া আর মৃত্যুর মতন। একদিন মনুষ্য জীবনের অন্ত অন্যদিকে নতুন শিশুর জন্ম। মানুষের জীবন আর নদীর জীবনের এই এক আশ্চর্য মিল। সতত প্রবাহমান, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত বয়ে চলেছে বিভিন্ন গতিতে, বিভিন্ন দিকে আর বিভিন্ন ছন্দে।

তিন. এই চক্রের কাজকর্ম, সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তা, বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া আমাদের এখনকার রাষ্ট্রের সীমার মেনে চলে না। নদী-জলপ্রবাহ-মৌসুমী বায়ু-ক্ষয়-সঞ্চয়-স্থিতি এই সীমানা মেনে চলে না। কিন্তু আমরা ধরে- নেই এই সীমানা স্থির-অনন্ত-চিরকালীন বিবেচনা করেই আমরা সমস্যার সমাধান করবো। আমরা অনুমান করি, নদী-জমি-উদ্ভিদ-জল আলাদা, বিযুক্ত, বিচ্ছিন্ন। এদের ব্যবস্থাপনাও অল্প সময়ের কিছু ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে ও অনুসরণ করে সফলভাবে করা যাবে।

বিদ্যায়তনিক এবং দাতা সংস্থা-বেসরকারী সংস্থাগুলোর গবেষণায় লক্ষ্যণীয়ভাবেই গত ১০০-১৫০ বছরের যে ‍উপাত্ত নথিতে পাওয়া যায়, উপগ্রহচিত্রে বা মানচিত্রে পাওয়া যায় সেই উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়। সেসব উপাত্তেও যে-সব পরিবর্তন ও পর্যবেক্ষণ রয়েছে তা নিজেদের সুবিধামতন বা নিজেদের প্রকল্পের চাহিদা অনুসারে ব্যবহার করা হয়। বৈজ্ঞানিকতার নামে প্রাতিষ্ঠানিক এবং বৃহত্তর উন্নয়র মডেলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ উপাত্তই হাজির করা হয়ে থাকে। বহু ক্ষেত্রেই জেমস রেনেলের মানচিত্র (১৮শ শতকের শেষের দিকে প্রকাশিত) থেকে নদীর পরিবর্তন নিয়ে আলাপ শুরু হয়।

চার. ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বন্যাকে বোঝার বড় প্রয়োজনের একটি কারণ, বন্যা এখন বা গত ২০০ বছর ধরেই কেবল ভয়াবহ এবং প্রলয়ঙ্করী হয় – এমন ধারণা থেকে সরে আসা। অবশ্যই এখন জনসংখ্যা অনেক বেশি। অবশ্যই এখন অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা হয়। অবশ্যই এখন অবকাঠামো অনেক বেশি। বিভিন্ন কারণে এখন মানুষের ভোগান্তিও অনেক বেশি। নজরেও আসে অনেক বেশি। মানুষের যন্ত্রনা ও ভোগান্তি সঙ্গতকারণেই আমাদের আক্রান্ত করে। কিন্তু যে-সব উপায়ে মানুষ জমি ব্যবহার করছে, জমিকে পালটে দিচ্ছে সে-সব উপায়ই তার জন্য ভয়াবহ ভোগান্তি তৈরি করছে। একথাও আমাদের মাথায় রাখা দরকার। আরেকটি কারণ হলো, বন্যা ও নদীর দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাস বোঝার মাধ্যমে আমরা কোনো নদীর ও সেই নদীর অববাহিকায় পরিবর্তিত আর ধারবাহিক ভাবে চলতে থাকা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো গভীর ও নিবিড়ভাবে বুঝতে পারি। মানুষ ও নদীর বা মানুষ-জমি-নদীর পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্দ মিথষ্ক্রিয়ার ধরন বুঝতে পারি। মানুষের অভিযোজনের প্রক্রিয়া ও ধরনগুলো বুঝতে পারি। এই বোঝাপড়ার সঙ্গে আমাদের বর্তমান আধুনিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক আর ফারাকও চিহ্নিত করতে পারি। জল-স্থল-অন্তরীক্ষের বিজড়নের দুনিয়ায় মানুষ কেবল সক্রিয় কুশীলব না, এই বিজড়ন ও সম্পর্ককে পালটে দেওয়ার হক কেবল মানুষের নাই তাও উপলব্ধি করতে পারি। মানুষ সেই স্বেচ্ছালব্ধ হকের বড়াই করার অন্যতম ফলাফল যে আজকের ভোগান্তি-যন্ত্রনা-মৃত্যু সেই অনুভবের জন্য এই ইতিহাস-চৈতণ্য বড়ই জরুরি।

পাঁচ. প্রতিবেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আমাদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বহু চিন্তা ও তৎপরতাই নদী-বন্যা-যন্ত্রনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের উন্নয়নকামী বয়ান, রাষ্ট্রভিত্তিক বন্যা ও নদীব্যবস্থাপনা ভাবনা, জমি-নদী-জলকে-আকাশকে নিজেদের সম্পত্তি ও সম্পদ হিসেবে ধরে-নেয়ার বিপদ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এই ইতিহাস ও ইতিহাস-বোধ। ঐতিহ্যগত ভাবে সুনির্দিষ্ট প্রতিবেশগত পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের বোঝাপড়া আমাদের জানাতে পারে একটা জায়গার মানুষ কীভাবে শত শত বছর ধরে বিভিন্নভাবে বন্যার সঙ্গে বসবাস করেছে। বন্যা-নদী-জলাভূমির সঙ্গে কখনো বিরোধ করে, কখনো আপোষ করে নিজেদের কেবল বাঁচিয়ে রাখে নাই। গড়ে তুলেছে বসতি, নগর, বন্দর। বিকশিত করেছে চাষাবাদ। প্রসারিত করেছে বাণিজ্য। যখনই মানুষ তার সীমা অতিক্রম করেছে তখনই তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে। এই ঘটনা কেবল আজকের অ্যানথ্রোপসিনেই জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতাবৃদ্ধির কালেই ঘটে নাই। হরপ্পা সভ্যতার বিস্তৃত পরিসরে কোনো কোনো অঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তন, অধিক প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ, বন্যার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধ সেই সভ্যতার নগরকেন্দ্রগুলো পরিত্যাগ করতে মানুষকে বাধ্য করেছিল। এমন ঘটনা এখন থেকে প্রায় ৪০০০ থেকে ১৭০০ বছর আগের। হরপ্পা সভ্যতার বসতিগুলোতে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক কম ছিল। তখন গঙ্গা-যমুনা অববাহিকা বা দক্ষিণভারতে নতুন ভাবে বসতি তৈরি করার সুযোগও ছিল। আজ আমাদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমনাগমন করার সুযোগ আছে ঠিকই। কিন্তু নতুন বসবাসের স্থানেও আমাদের বন্যা না হলে অন্য কোনো ভয়াবহ সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা উদ্বাস্তু হচ্ছেন আজ তারা হয়ত ফুটন্ত কড়াই থেকে চুলার আগুনে পড়ছেন। আমি কেবল একটা উদাহরণ দিলাম। এমন উদাহরণ সাম্প্রতিক কালের প্রত্নজলবায়ুবিদ্যাগত বিভিন্ন গবেষণায়েই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাসে উঠে আসছে। কেবল বাংলাদেশে আমরা এই আলাপচারিতা থেকে নানাকারণে দুরত্ব বজায় রাখছি বা এই আলাপচারিতাকে অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছি।

৩.

মৌসুমী বায়ুর ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বদল বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টিপাতের হার ও পরিমান পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের হিমালয়ের পাদদেশে এবং মৌসুমী বায়ুপ্রবাহ প্রভাবিত দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাংশে বৃষ্টিপাতের হার-সমেত, জলবায়ুর পরিবর্তনের নানামুখী প্রবণতা বোঝা সম্ভব। পাশাপাশি, প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট বন্যা বা খরার, অতিবৃষ্টির বা অনাবৃষ্টির, জমি গঠন বা ভাঙ্গার প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা ও অনুমান করা সম্ভব। বহু গবেষক এই ধরনের গবেষণা করেছেন। তবে সেই গবেষণার উপাত্ত প্রধানত হিমালয়ের পাদদেশীয় বিভিন্ন গুহায় প্রাপ্ত স্টালাগমাইট (ছাদ থেকে মেঝেতে চুইয়ে পড়া পানির কারণে গুহার মেঝেতে জমা হওয়া বিভিন্ন খনিজ পদার্থ দিয়ে গঠিত ও সঞ্চিত এক ধরনের ডিপোজিট) এবং পূর্ব ও মধ্য ভারতের হ্রদে সঞ্চিত পলল ও প্রত্নউদ্ভিজ্জ উৎসের ভিত্তিতে বিশ্লেষিত হয়েছে। কিন্তু মেঘালয়সহ হিমালয়ের পূর্বাংশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহিত ও বিশ্লেষিত উপাত্ত আমাদের বদ্বীপের পরিস্থিতি আনু. গত ২০০০ বছরে কেমন ছিল সে-সম্পর্কে ধারণা দেয়। গবেষকগণ মেঘালয়ের গুহা থেকে প্রাপ্ত স্টালাগমাইটের বিশ্লেষণ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে গত ২০০০ বছরে মৌসুমী বায়ুর নানামুখী বদল ও বৃষ্টিপাতের পরিমান ও হারের বদল নিয়ে দারুণ গবেষণা করেছেন। হিমালয়ের পাদদেশীয় নানা স্থান থেকে পাওয়া স্ট্যালাগমাইট ও অন্যান্য নমুনা ব্যবহার করে গবেষকগণ মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের শতকওয়ারী বদল, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং সম্পর্কিত বন্যা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। আরো নানা গবেষণা হচ্ছে আমাদের দেশের বাইরে। সেই গবেষণার উপাত্তের নানা ধরনের মডেলিংয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে মৌসুমী বায়ু ও বৃষ্টিপাতের পরিমান-হার সম্পর্কে পূর্বাভাসও প্রদান করেছেন অনেক গবেষক। সেই গবেষণার ফলাফল খুব বেশি আশাবাদী করে না। সামনে আমাদের জন্য আরো বেশি বৃষ্টিপাত ও আরো বড় আকারে বন্যা পৌনপুনিকভাবে ঘটতে থাকবে, বাড়তে থাকবে। অধিক বৃষ্টিপাতের পর্বগুলোর বিরতি কমে আসবে। সুতরাং, অতীতের নথি ও উপাত্তর বিশ্লেষণ আর পর্যালোচনা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা যারা গুরুত্বর সঙ্গে করতে চান তাদের জন্যও দরকারী।

বহু ক্ষেত্রেই বন্যা (ও ভূমিকম্প) একইসঙ্গে বা একের পর এক ঘটায়, অথবা বড় ধরনের বন্যার প্রতিক্রিয়ায় নদীর গতিপথ ও প্রবাহের প্রকৃতি ও পরিমানে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। যেমন ঘটেছিল তিস্তা ও ব্রক্ষ্মপুত্রের ক্ষেত্রে গত ৩০০ বছরে। তিস্তা নদী আর ব্রক্ষ্মপুত্র নদ কেবল অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকেই তাদের গতিপথ ও প্রবাহ আকষ্মিকভাবে পরিবর্তন করে নাই। এমনকি যে পরিবর্তন আকষ্মিক বলে ধারণা করা হতো, গবেষকগন দেখিয়েছেন, সেই পরিবর্তনও বন্যা ও ভূমিকম্পের মতন প্রভাবকের কারণে শুরু হয়েছিল বটে। তবে সামগ্রিকভাবে নদী-ব্যবস্থা (প্রধান নদী ও তার শাখা/উপনদীসহ পুরো অববাহিকার জলনিষ্কাষন ব্যবস্থা) ও নদী-ব্যবস্থার অববাহিকার ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছিল। বর্তমান ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র নদ ছিল এই পরিবর্তনের আগের প্রবাহ খাত। পঞ্চগড়ের বর্তমান করতোয়া নদী আর বর্তমান তিস্তা নদীর মাঝখানের একটা বড় এলাকায় মধ্যে তিস্তা নদী বারবার তার প্রবাহ-খাত বদলেছে আমাদের জানা অষ্টাদশ শতকের বদলের আগেও। ব্রক্ষ্মপুত্রও একটা উপত্যকার মধ্যে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, আর পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে তার প্রবাহপথের একটা অংশের বদল ঘটিয়েছে অষ্টাদশ শতকের আগে। এই পরিবর্তনগুলো আকস্মিক বা ধীরগতিতে হয়। নদীর খাতের বদল, নদীর প্রবাহের একটা বড় অংশ অন্য কোনো ছোট নদীর খাতে বা অন্য কোনো এলাকা দিয়ে নতুন খাত তৈরি করে হওয়া প্রবাহের বদল, নদীর খাতের তলদেশে ক্ষয় হয়ে প্রবাহ ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাওয়ার বদল, নদীখাতের এক পাশ থেকে আরেক পাশে বাঁক পরিবর্তন করে রৈখিক ভাবে স্থান বদল ইত্যাদি নানাভাবে নদী ও জলধারা বদলাতে থাকে। সাথে সাথে বদলায় গতিপথ ও প্রবাহর পরিমান ও ধরন, পলি পরিমান, ধরন এবং মাত্রাগত বদল, পলি প্রবাহের প্রকৃতিতে বদল, ক্ষয় ও সঞ্চয়ে স্থান, প্রকৃতি আর সময়ের ধীর গতিতে বদলসহ বিচিত্র কার্যকারণ ও প্রক্রিয়া মিলিয়ে নদী-জলাভূমি-জমির অবিচ্ছেদ্য মিথষ্ক্রিয়া চলমান থাকে। বাংলাদেশে একটি নদ-নদীও পাওয়া যাবে না যে নদ-নদী শত শত বছর ধরে একই রকম রূপ, অবস্থান ও পানি প্রবাহ বজায় রেখে চলেছে।

এমনকি নদীকে আমরা যদি একটা খাদ ধরে বয়ে চলা জলের ধারা হিসেবে বুঝি তাহলে মুশকিল হতে পারে। বছরের বিভিন্ন সময়ে নদীর পানি আর জমির সম্পর্ক বদলায়। শীতকালে পানির ধারা ক্ষীণ হয়, নদীর চেহারা-প্রকৃতি-কাজ বদলে যায়। মানুষের সঙ্গে সেই নদীর সম্পর্ক একরকম থাকে। বর্ষাকালে সেই নদী কেবল তার খাত পাড় ছঁই ছুঁই করে ভরে যায় না, খাতের পাড় ছাড়িয়ে জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। একভাবে ভাবলে শীতকালে জমি বাড়ে, পানি কমে। বর্ষাকালে জমি কমে, পানি বাড়ে। কোন সময়ে পানিপ্রবাহকে আমরা নদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করবো? আমাদের দেশে শীতকালে বা বর্ষার পরেই জল নেমে যাওয়ার পরে উন্মুক্ত জমিতে মানুষ সাময়িকভাবে চাষাবাদ করে। বর্ষাকালে আবার ফিরে যায় অন্যত্র। অথবা জমি-জলের সঙ্গে নতুন মিতালী পাতায়। এই মিতালী আর মনান্তর উত্তরে একরকম, দক্ষিণে একরকম, দক্ষিণপূর্বে আরেকরকম, উত্তরপূর্বে আরেকরকম। কীর্তিনাশা বা পাগলী অথবা রাক্ষুসী বা সর্বনাশী নামে সর্বস্ব হারানো মানুষ নদীকে গালি দেন, অভিশাপ দেন, নদীর কাছে আকুতি জানান। নদীকে অস্তিত্বের অন্তরঙ্গ সতত সংলগ্ন প্রেমাস্পদ কিংবা সঙ্গী হিসেবে অনুভব করেন। আধুনিক মানচিত্রবিদ্যা বা জমিজমার সীমানা মাপা ও নির্ধারণ করার তরিকা অনেক সময় এই বিচিত্র ও নিয়ত বদলের দুনিয়ায় কাজই করে না। কোনো কোনো স্থানে জমির সীমানার নথিভুক্ত সীমানা ও মালিকানা কোনো অর্থ বহন করে না। যে জমি আজ মানুষের বসতঘর, গমগমে বাজার-হাট, বা খেলার মাঠ। সেই জমি আগামীবছর হয়ত পানি আর পানি। যে নদী আজ এইখানে, সেই নদী আগামী বছরই ওই খানে। আমার বাঁধ দিয়ে এই বদলকে, এই সম্পর্ককে একই রকম বা স্থির রাখার চেষ্টা করি। আমরা নানা মাপজোক, হিসাবনিকাশ, আর বৈজ্ঞানিক তরিকা দিয়ে এই বদলের বোধগম্য হিসাব কষার চেষ্টা করি। সেই বদলের হার ও প্রবণতার হিসাব কষে সেই হিসাব অনুসারে ভবিষ্যতে বদল কেমন হবে বা কীভাবে হবে তা অনুমান করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্তু পারি কি? পারি যে না তার নানান সাক্ষ্য ও চিহ্ন আমাদের এই বদ্বীপের পানি-জমি-বসতির ইতিহাসে, নদীর ইতিহাসে, জলাভূমির ইতিহাসে, অরণ্যের ইতিহাসে, উদ্ভিদের ইতিহাসে নানাভাবেই ছড়িয়ে আছে, লুকিয়ে আছে, হারিয়ে আছে । আমরা সেই লুকানো-হারানো-ছড়ানো সাক্ষ্য-চিহ্ন খুঁজতে একেবারেই আগ্রহী না। আমরা কতটা সভ্য ছিলাম কত আগে। আমরা কতটা আগে থেকেই জতিগতভাবে বীর, ও সমৃদ্ধ। আমরা কত পুরানো সময়ে সভ্যতা তৈরি করেছিলাম। সেই সব খুঁজতে গিয়ে বহু সাক্ষ্যকে বাদ দেই, বহু সাক্ষ্যকে গুরুত্বই দেই না, বহু চিহ্নকে ইচ্ছামাফিক জাতির গৌরবগাঁথা রচনা করতে গিয়ে পালটে ফেলি।

৪.

নদীভাঙ্গন, বন্যা, নদীর প্রবাহের বদল মানুষ ও অন্যান্য জীবের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। মানুষ বাস্তুভিটা হারায়, উদ্বাস্তু হয়, জীবিকা হারায়, সর্বস্ব হারায়। শুনতে খারাপ লাগতে পারে। নীতিনির্ধারক ও ক্ষমতাবান মানুষেরাই এই হারানোর জন্য দায়ি। যে চিন্তা আর পদ্ধতি দিয়ে তারা এই হারানোর মোকাবিলা করতে চান সেই চিন্তায় মানুষই কর্তা ও কুশীলব। মানুষই ধরে-নেয় সে সকল প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে সে প্রকৃতিকে, নদীকে, জমি-জলের সম্পর্ককে পাল্টে দেবে। শাসন করবে প্রকৃতিকে, যেভাবে ক্ষমতাবান প্রবল কর্তৃত্ব শাসন করে দুর্বল, ক্ষমতাহীনকে। দখল করবে, নিজের লোভ-বাসনা-ভোগ দিয়ে প্রকৃতিকে নিজেদের (উপ)ভোগের পণ্য বা নিসর্গ করে তুলবে। এই আকাঙ্খার জন্ম পঞ্চদশ শতকের পরে। পশ্চিমা আধুনিকতার চিন্তার প্রসার, সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্ব, ঔপনিবেশিক বিস্তার আর ইউরোপীয়দের কাছে বাদবাকি দুনিয়া ‘আবিষ্কারের’ কালে।।

আজ নিয়ন্ত্রিত টেকসই উন্নয়নের বয়ান খুবই জনপ্রিয়। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা যে-উন্নয়নে জমি-জলের-অন্তরীক্ষ তাড়াতাড়ি ও সার্বিকভাবে ধ্বংস হবে না। যেন আমাদের দরকার ও প্রয়োজন অনুসারে টিকে থাকাই জল-স্থল-অন্তরীক্ষের মহান দায়িত্ব। এই ধারণাও তাই আগাগোড়া দখল-শাসন-ভোগেরই পরিমার্জিত রূপ বলে মনে করেন দীপেশ চক্রবর্তীর মতন ইতিহাসবিদগণ। তিনি মনে করেন, টেকসই উন্নয়নের ধারণার প্রতিস্থাপন দরকার বেঁচে-থেকে-যাপন করার বা ইনহেবিটিবিলিটির ধারণার মাধ্যমে।  ইতিহাসে যেমন দেখা যায় একেক ধরনের প্রতিবেশে একেকভাবে মানুষ যাপন করেছে এই বদ্বীপে। জল-জমির স্থানিক বিভিন্ন ধরন ও তার বদলকে আমলে নিয়ে যেমন একেক ধরনের শস্য-ধানের আবাদ করেছিল এই বদ্বীপে। নদী ও বন্যাকে পুরোপুরি না-ঠেকাবার চেষ্টা করে, একটা সময়ে বাঁধ দিয়ে চাষাবাদ করে ফসলকাটার পরে বৃষ্টির দিনে সেই বাঁধ কেটে দিয়ে জমিকে প্লাবিত হতে দিত দক্ষিণের জোয়ার-ভাটার প্রভাববলয়ের ভূখন্ডে। একেক ধরনের পানির উচ্চতা-হেরফের-বর্ষার ধরণ-জমির ধরন- জলের স্থায়ীত্ব নিজেদের অভিজ্ঞতায় যাপন করে সঙ্গতি রেয়ে ফসল উৎপাদন, যোগাযোগ, জমির ব্যবহার, শিল্প উৎপাদন, ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন ঠিক করত। মানুষ ও প্রকৃতির এমন মিথষ্ক্রিয়ার যাপন ও জীবিত থাকার ঐতিহ্যকে আমরা পশ্চাদপদ-প্রগতির অন্তরায়-অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করি এখন।

অনেক বিভিন্ন প্রাক-ঔপনিবেশিক যাপনের ও মিথষ্ক্রিয়ার ঐতিহ্যে ফিরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে গেছে। আমাদের জীবন অনেক পালটে গেছে। জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রযুক্তির অনেক কিছু আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জমি-পানির সম্পর্ককেও আমাদের আধুনিক জীবন বহুভাবে বদলে দিয়েছে। তাই, আমরা ইতিহাস জেনে সেই আগের যাপনে ফিরে যাব, প্রকৃতির সন্তান হয়ে উঠবো এমন রোমান্টিক ইউটোপীয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কোনো জরুরত আমার নাই। তবে, আমি স্পষ্টভাবেই মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে না-পারলেও, বা পারা-অসম্ভব হলেও, প্রকৃতি বা প্রতিবেশের এক শরীক হিসেব মানুষকে বেঁচে থাকা শিখতে হবে। ইতিহাসকে আমলে নিতে হবে। দখলদার হিসেবে লোভ আর উন্নতির ধারণা, উন্নয়নকে প্রশ্নাতীতভাবে নিজেদের জন্য ইতিবাচক মনে করার আর স্বল্পমেয়াদী সুখকে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির চাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার শিক্ষা ও অভ্যাস ভুলে যাওয়ার কঠিন চেষ্টা করতে হবে। এই আলাপচারিতা আপনাদের কাছে উন্মাদের আলাপ কিংবা অবাস্তব মনে হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক কচকচানী লাগতে পারে। বেহুদা মনে হতে পারে। তাহলে বরং আপনারা আপনাদের মতন করে চেষ্টা করতে থাকুন। মনে রাখবেন, ইতিহাসই আমাদের বলে দেয় না আপনাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। নিজেদের অনড়-অবিচল-চিরন্তন প্রগতি-উন্নয়ন-মুনাফা-ভোগের প্রতি বিশ্বাস নড়বড়ে করে দেওয়ার জন্য হলেও নদী-জল-জমি-মানুষের যৌথতার ইতিহাস জানাবোঝা দরকার।

আমরা দেখিয়েছি যে, মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর ও সংলগ্ন বসতিও করতোয়া ও অন্যান্য সম্পর্কিত নদী-ব্যবস্থার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছিল। হয়ত নদী ও জলের বদলই একমাত্র কারণ ছিল না। দিনাজপুর-জয়পুরহাট-ঠাকুরগাও-নীলফামারী-রংপুরে দীর্ঘদিনের গবেষণায় আমরা বার বার লক্ষ্য করেছি নদী ও নদীব্যবস্থার বদল (জলপ্রবাহ-বন্যা-নদী উপত্যকার রূপগত পরিবর্তন ইত্যাদি) সেখানকার ৭ম-৮ম শতক পরবর্তী বসতিতে প্রভাবিত করেছে। মানুষ নিজেদের মানানোর চেষ্টা করেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। নীলফামারীর ধর্মপাল রাজার গড়, পঞ্চগড়ের ভিতরগড়, কিংবা দিনাজপুরে কান্তনগরের প্রাচীরঘেরা বসতির ক্ষেত্রে বসতি তৈরি ও ব্যবহারের কোনো-না-কোনো সময়ে পাশের নদীটিকে প্রাচীর মূল বসতির মধ্যেই নিয়ে আসা হয়েছে। নদীর প্রবাহকে ব্যবহার করার সঙ্গে সঙ্গে নদীকে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ ও বন্যাকে মোকাবিলা করাই সম্ভবত অন্যতম কারণ ছিল। রংপুরের পীরগঞ্চ-মিঠাপুকুর এলাকায় মাটির বাঁধ দিয়ে বসতিকে সীমায়িত করার পাশাপাশি জলপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রন করে চাষাবাদের জমি বছরের কোনো এক সময়ে হলেও ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাঁধ একই ভাবে রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃতও হয়েছে এখন যেমন হয়। খাল খনন করে পরিখার জলের সঙ্গে যুক্ত করে একদিকে বসতিকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে সেই পানি সেচের জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে। বন্য হয় প্রতিবছর এমন জমিতে অসংখ্য বসতি তৈরি হয়েছিল। বন্যাকে নানাভাবে ব্যবস্থায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার বন্যার কারণে, বা নদীর প্রবাহের বদলের কারণে মানুষ ভুক্তভোগীয় হয়েছে। মানুষ বন্যাকে ও নদীকে পরাজিত করার চেষ্টার বদলে তারে সঙ্গে বসবাস করার চেষ্টা করেছে নানাভাবে।

জল বা নদী বা জলাভূমি দীর্ঘসময় ধরে বসতি-গ্রাম-প্রশাসনিক এককের সীমানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জলের ও জমির ঘনিষ্ট অস্তিত্বর বদল সেই সীমানাকে বদলে দিয়েছে। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারে বিভিন্ন সময়ে সংলগ্ন নদীপথের বদল আর বৌদ্ধ বিহার ও বিহার সংলগ্ন বসতির ও স্থাপত্যনকশার বদল ঘটেছে। এমনকি বর্তমান সোমপুর মহাবিহারের স্থানে আগে থাকা একটি স্থাপনা (যার প্রকৃতি এখনো স্পষ্ট নয়) পরিত্যক্ত হয়েছিল যেসব কারণে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল নদীর গতিপথের রৈখিক ধীরগতির বদল ও বন্যা। নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বরে আমরা বন্যার কারণে আদি ঐতিহাসিক বসতির বড় ধরনের রূপান্তর ও ধ্বংস ঘটেছিল বলে অনুমান করেছি। সংলগ্ন নদীব্যবস্থার বদল ও বন্যা এখানের আদি ঐতিহাসিক বসতি আংশিক বা পুরোপুরিভাবে মানুষকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল বলে প্রাপ্ত ভূতাত্ত্বিক উপাত্তের ভিত্তিতে অনুমান করা যায়। আবারও কয়েক শতক পরে হয়ত মানুষ পুনরায় ফিরে এসেছিল ও বসতি তৈরি করেছিল সেখানে, আনু. খ্রি. ৭ম-৮ম শতক বা পরে। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ক্ষুদ্রাকার ব্রাক্ষ্মী শিলালিপিটি সাক্ষ্য দেয় যে, খ্রি.পূ. ৩য়-২য় শতকে পুণ্ড্রনগরের মৌর্য প্রাদেশিক প্রশাসকগণ বন্যার ক্ষতিগ্রস্ত তৎকালীন সমবঙ্গীয়দের (এখনকার বাংলাদেশের মধ্যভাগ ও দক্ষিনপশ্চিমাংশের অধিবাসীগণ?) জন্য বীজধান অনুদান হিসেবে দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা তখনও ছিল, বন্যা তখনও ছিল, মানুষের ভোগান্তি তখনো ছিল। এখনো আছে। কিন্তু মানুষের সংখ্যা, লোভ, ক্ষমতা, শাসন ও ক্ষুধা বেড়েছে অনেক।

একটি স্থানে মানুষের বসতি বার বার বন্যার কারণে পরিত্যক্ত হওয়া এবং পুনরায় বসতির জন্য ব্যবহৃত হওয়ার খুব ভালো উদাহরণ পাওয়া গেছে ভারতের পশ্চিমবাংলার মালদা জেলার বালুপুর নামের প্রত্নস্থান থেকে। গৌড় নগরের নিকটবর্তী এইস্থানে মানুষ ৭ম-৮ম অষ্টক শতকে প্রথম বসতি তৈরি করেছে। বার বার বন্যা হয়েছে। বন্যার পলির নিচে সেই বসতি চাপ পড়েছে। আবারো মানুষ এসে পরে বসতি তৈরি করেছে। বন্যা মানুষকে যেমন ঠেকাতে পারে নাই, মানুষও বন্যারে ঠেকাতে পারে নাই। মধ্যযুগের গৌড় নগরে বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা ও নদীভাঙ্গন মোকাবিলা করার উদাহরণ বিভিন্ন সূ্ত্রেই পাওয়া যায়। এমনকি নগরীটি পরিত্যক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে এই বন্যাকে নিয়ন্ত্রন করতে না-পারা এবং গঙ্গা-ভাগীরথীর প্রবাহের পরিবর্তনকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

উত্তরবঙ্গের মানুষ অসংখ্যা পুকুর ও দিঘী খনন করেছিল খাবার পানির জন্য। বৃষ্টির জল জমিয়ে রেখে সেচের জন্য। দক্ষিণবঙ্গের মানুষ পুকুর খুড়েছিল লবনাক্ততা মুক্ত মিষ্টি পানি খাওয়ার জন্য। পুকুরের ব্যবহার এখন অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পুকুর-জলাভূমি-বর্ষাকালে পানি জমে বা পানি নিষ্কাশিক হয় এমন নিচু জমি ভরাট করে আমরা আকাশচুম্বী অট্টালিকা, কলকারখানা, প্রমোদ উদ্যান, বা থাকার বাড়িঘর তৈরি করছি। জমির চেহারা ‍ও ব্যবহার পুরোপুরি পালটে দিচ্ছি। মানুষ আগেও জমিকে রূপান্তরিত করেছে। নিচু জমিতে মাটি ফেলে উঁচু করে সেই জমিতে ঘরবাড়ি বানিয়েছে, মাটি খুঁড়ে সেই মাটি দিয়ে ঘর বানিয়েছে বা অন্যকাজে সেই মাটি ব্যবহার করেছে। তবে যখনই মানুষ জমি ও জলের সম্পর্ককে পুরোপুরি পালটে দিতে চেষ্টা করেছে তখনই তাদের কোনো -না-কোনো ভাবে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। এই ছবক আমরা ইতিহাস থেকেই পাই।

আজ গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ দেই। একসময় জমির নিচে পানি থাকবে না। এখনই থাকে না। নলকূপের গভীরতা বাড়াতে হয় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার জন্য। এখনই উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষ মিষ্টি ও পানের উপযুক্ত পানি খেতে পায় না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে গবেষণা, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাঁধনির্মাণ, নদীশাসন এবং লবনাক্ততা নিয়ন্ত্রনের সকল প্রচেষ্টার পরেও।

৫.

টেরাফরমিং একটা নতুন শব্দ সমাজবিজ্ঞানে। প্রধানত টেরাফরমিং পদটি তৈরি হয়েছে গ্রহসংক্রান্ত বিজ্ঞানে। অন্য গ্রহকে মানুষের বসবাসযোগ্য করার জন্য দরকারমতন পরিবর্তন করার নামই টেরাফরমিং। সেই শব্দটিই এখন সমাজবিজ্ঞানীগণ ব্যবহার করছেন পৃথিবীর জমি-জল-জীবনকে এক সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন উন্নয়নের ও ভোগের আখ্যানের অধীনে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে বদলে ফেলার গত ৩০০ বছরের তৎপরতাকে বোঝাতে। এই টেরাফর্মিংকে মানুষের সামর্থ্য-শ্রেষ্টত্ব-গৌরব হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আবার, আমরা এই টেরাফর্মিংকে মানুষের উদগ্র লোভ, প্রবল দাপট, আর ভয়াবহ শাসন বোঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারি। কোন অর্থে আপনি বা আমি বা আমরা ব্যবহার করবো তা বোঝার জন্য, উপলব্ধি করার জন্য আর আধুনিক অভ্যাস-প্রবৃত্তি-ঝোঁক ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়ার জন্যও নদী-জল-জমির ইতিহাস জানা অপরিহার্য। জীবন-জল-জমির বা নদী-জলাভূমি-জলের সম্পর্কর মধ্যে মানুষ হিসেবে আমরা একটি অংশ মাত্র। এই ক্ষুদ্রতা ও দীনতার অনুভূতি নিয়েই আমাদের বন্যার মোকাবিলা করতে হবে। আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ভুক্তভোগী নদী-জলাজমি-জমির প্রতি সহমর্মী ও সমব্যথী হতে হবে। আমি জানি না সেটা সম্ভব কীনা আমাদের পক্ষে। তবে অসম্ভবের দাবি করতে তো কোনো সমস্যা নাই।

বন্যার ইতিহাস, জল-স্থল-অন্তরীক্ষের ইতিহাস আমাদের আত্মসমালোচনার পথ খুলে দেয়। হিমালয়ের পাদদেশে বন ও উদ্ভিদ উজাড় করে, জলাভূমি দখল করে, বা বন্ধ করে দৃশ্যমান গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করে, অথবা নিচু জমি ভরাট করে দালান-কোঠা বানিয়ে, কলকারখানা বানিয়ে, নদীতে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে আমরা উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রগতির সাময়িক উদযাপন করতে পারি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – এই বিকাশ ও উন্নয়ন নিয়ে আমরা বেঁচে থাকতেও পারবো না। নিজেদের যতই ক্ষমতাধন, প্রযুক্তির অধিপতি আর শ্রেষ্ঠ ভাবি না-কেন! দালানকোঠা, রাস্তা, কলকারখানা খেয়ে বা পান করে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার কোনো উপায়ই থাকবে না যদি আমরা ন্যুনতম সম্মানের সঙ্গে, ভাত খেয়ে, কাপড় পড়ে বেঁচে থাকতেই না-পারি। ইতিহাস আমাদের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা হয়ত দিতে পারবে না। কিন্তু আমাদের আতঙ্কিত করতে পারে, আমাদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে, আমাদের মধ্যে সংশয় তৈরি করতে পারে, আমাদের সতর্ক করতে পারে, এমনকি আমাদের নদী-জল-জমির প্রতি সহমর্মীতার-সমবেদনার-ভালেবাসার অভ্যাস রপ্ত করতে সাহায্যও করতে পারে।

নৈরাষ্ট্রিক এক বাতাবরণে, মানুষ ও না-মানুষের সকলের পরস্পরের প্রতি সহমর্মীতা ও ভালোবাসার অভ্যাস রপ্ত করে, নদী-জমি-জলের দখলদার হওয়ার ক্ষমতার দম্ভ পরিত্যাগ করার জন্য আমাদের ইতিহাস জানাবোঝা আর ইতিহাসবোধের গড়ন বদলানো সাহায্য করতে পারে। গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা নদীর অববাহিকা আর সেই অববাহিকা, হিমালয় ও পাদদেশীয় অঞ্চল আর সমুদ্রের মৈত্রী ও ঘনিষ্ঠতার মতন মানুষ-প্রকৃতির-প্রাণের রাষ্ট্রান্তরী উদযাপনের পথ তৈরি করার আপাতভাবে দুঃসাধ্য চেষ্টা করেই একমাত্র আমরা আমাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে পারবো। অন্য কোনো উপায় নাই। অন্য কোনো জীবন নাই। অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি নাই। আর কোনো স্বপ্ন ও ভালোবাসাও নাই। অবশ্য, আপনি, আমি ও আমরা যদি মনে করি আমাদের নিজেদের, একটি প্রজন্মের, একটি জায়গার, একটি দেশের, একটি শ্রেণির, একটি জাতির মানুষের বেঁচে থাকাটাই সব, তবে আমার অনুমান, আপনার বা আমাদের স্যানাটেরিয়ামে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।

২১ জুন ২০২২

[এই লেখাটি একটি প্রাথমিক খসড়ামাত্র]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Blog at WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: